আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর দেশটিতে মজুত বিপুল তেল উত্তোলন করে তা ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার ‘নিরাপদ’ পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে কার্যত পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে সেখানে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। ধারণা করা হয়, ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত আছে। ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো দেশটির ‘ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়া’ তেল অবকাঠামো মেরামত করবে এবং এই সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশটির জন্য আয় নিশ্চিত করবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন মোটেও সহজ হবে না। বরং এর পথে রয়েছে বহু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ।
তেল আছে, কিন্তু উৎপাদন নেই
মজুত বিপুল হলেও ভেনেজুয়েলা বর্তমানে খুবই সীমিত পরিমাণ তেল উৎপাদন করতে পারছে। ২০০০ সালের গোড়ার দিক থেকে দেশটির তেল উত্তোলন তীব্রভাবে কমতে শুরু করে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজ রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোলিয়াম অব ভেনেজুয়েলা (পিডিভিএসএ)–এর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। পরবর্তীতে নিকোলাস মাদুরো সরকারও একই নীতি বজায় রাখে।
এর ফলে বহু অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও কর্মী দেশ ছেড়ে চলে যান এবং তেল খাত কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগ না থাকায় অবকাঠামোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে ভেনেজুয়েলা দৈনিক গড়ে ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা বিশ্ব বাজারের এক শতাংশেরও কম। অথচ এক দশক আগেও দেশটি এর দ্বিগুণের বেশি তেল উৎপাদন করত।
নিষেধাজ্ঞার চাপ
২০১৫ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সেই নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী বছরগুলোতে আরও কঠোর হয়। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায় এবং তেল উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
যদিও শেভরনসহ কিছু পশ্চিমা কোম্পানি এখনও সীমিত পরিসরে কাজ করছে, সাম্প্রতিক কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের কার্যক্রমও সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলার মোট তেল উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শেভরনের মাধ্যমে হয়।
ভারী তেলের জটিলতা
ভেনেজুয়েলার তেলের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর প্রকৃতি। এখানকার অধিকাংশ তেল ‘ভারী ও টক’, যা পরিশোধন করা কঠিন। যদিও এটি ডিজেল ও আসফাল্ট তৈরিতে কার্যকর, তবে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত পেট্রোল উৎপাদনের জন্য ‘হালকা ও মিষ্টি’ তেল ব্যবহার করে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল কাজে লাগাতে অতিরিক্ত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ দরকার।
আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আইনি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। কোনো কোম্পানিকে সেখানে তেলকূপ খননের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে, যা মাদুরো–পরবর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
ডেটা প্ল্যাটফর্ম কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হুমায়ুন ফালাকশাহির ভাষায়, বর্তমান বাস্তবতায় সেখানে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করা অনেকটা ‘জুয়া খেলার’ মতো ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
সময় ও ব্যয়ের বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে এবং এর ফল পেতে এক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এমনকি সবকিছু অনুকূলে থাকলেও এটি রাতারাতি সম্ভব নয়।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও বিশ্ব তেল বাজারে এর প্রভাব হবে সীমিত। তেলের দাম সামান্য কমতে পারে, তবে ২০২৬ সালের মধ্যে এর বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগের পর ভেনেজুয়েলা যদি দৈনিক তিন মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদনেও ফিরতে পারে, তবুও তা বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদকদের কাতারে পৌঁছাবে না। কারণ ওপেকভুক্ত দেশগুলো ইতোমধ্যেই উচ্চহারে উৎপাদন করছে এবং বিশ্বে তেলের ঘাটতিও নেই।
তাহলে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা কি সফল হবে?
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত হলো—
ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, কিন্তু বাস্তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া এই পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।